হাত হারানো সেই রাজিব না ফেরার দেশে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা: রাজধানীর কাওরান বাজারে দুই বাসের চাপায় আহত রাজীব ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাজীবের খালা জাহানারা বেগম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক রাত ১২টা ৪০ মিনিটে আমাদের জানিয়েছেন রাজীব আর নেই। আমরা সবাই হাসপাতালে আছি।’

রাজীব ছিলেন বাপ-মা হারা। ছোটবেলা থেকেই খালাদের কাছে বড় হয়েছিলে তিনি। যাত্রাবাড়ীর মিরাজিবাগে একটি মেসবাসায় ভাড়া থেকে রাজীব হোসেন তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করতেন। একই সঙ্গে সে বরিশালের একটি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স করছেন। তার ছোট ভাই মেহেদী হাসান (১৩) ও আব্দুল্লাহ (১১) দুজনই রাজধানীর তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা ও এতিমখানায় পড়ে। নিজের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি ভাইদের খরচও বহন করতেন রাজীব।

এর আগে, রাজীবের চিকিৎসার জন্য ডা. শামসুজ্জামান শাহীনকে প্রধান করে মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের অন্য সদস্যরা ছিলেন- নিউরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক অসিত চন্দ্র সরকার, মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মজিবুর রহমান, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর হোসেন, অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইদুল ইসলাম, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পরিচালক ও অধ্যাপক আবুল কালাম ও অর্থপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম।

উল্লেখ্য, গত ৩ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে দুই বাসের চাপায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের (২২) হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ৪ এপ্রিল বিকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজীবকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। গত ৬ এপ্রিল রাজীবের চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান শাহীন জানিয়েছিলেন, রাজীব এখনও আশঙ্কামুক্ত নয়। কারণ, হেড ইনজুরি আছে। মাথার সামনের অংশ আঘাতপ্রাপ্ত। মাথার হাড়ে ফাটল আছে।

এর আগে দুই বাসের চাপায় হাত হারানো কলেজছাত্র রাজীব হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের প্রধান শামসুজ্জামান শাহীন এই তথ্য জানিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, মাথায় আঘাতজনিত কারণে রাজীবের নিউরোলজিক্যাল অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এ ছাড়া শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় রাজীবকে লাইফসাপোর্টে রাখা হয়েছে।

রাজীব হোসেনের মামা জাহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন,মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটা থেকে রাজীবের কোনো সাড়াশব্দ নেই। নড়াচড়া একেবারেই কম ছিল। তারপর ডাক্তাররা তাকে লাইফ সাপোর্টে রেখেছেন।

জানা যায়, প্রতিদিনের মতো গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্র মঙ্গলবার বিআরটিসির একটি দোতলা বাসে পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। এ সময় স্বজন পরিবহনের একটি বাস তার বাসটিকে ঘেঁষে ওভারটেক করতে গেলে মাঝখানে চাপা পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার ডান হাত। তাকে উদ্ধার করে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

অবস্থার অবনতি হলে পর দিন বুধবার তাকে ঢামেক হাসপাতালে নেয়া হয়। সংকটাপন্ন রাজীব ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

জানা গেছে, ১০ বছর আগে মা ও ৮ বছর আগে বাবা হারান রাজীব। এতিম দুই ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী বাউফল থেকে চলে আসেন ঢাকায়। ঠাঁই মেলে খালা জাহানারা বেগমের কাছে। খালা তাকে রাজধানীর পোস্ট অফিস হাইস্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি করিয়ে দেন।

পরে রাজীব ভর্তি হয় সরকারি তিতুমীর কলেজের বাণিজ্য বিভাগে। তার ইচ্ছা ছিল এতিম দুই ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার। কিন্তু দুই বাসের চাপায় ডান হাত হারিয়ে মৃত্যু বরণ করলেন রাজীব।

তার ছোট দুই ভাই মেহেদী হাসান (১৩) ও আবদুল্লাহ (১১) কোরআনে হাফেজ। মাদ্রাসার পাঠ চুকিয়ে হাসান সপ্তম শ্রেণিতে ও আবদুল্লাহ ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে।

রাজীব হোসেনের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সরকার বহন করবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। সুস্থ হলে তাকে সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন মন্ত্রী। গত বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন রাজীবকে দেখার পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছিলেন।

Print Friendly, PDF & Email
Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *